বেশ কয়েকদিন ধরেই বর্ষার পানির অপেক্ষায় ছিল জাইকার খাল খনন প্রকল্পের
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি)। আর ঠিক হয়েছেও তাই। সেই কাঙ্ক্ষিত
বৃষ্টিতে এবার তাদের পোয়াবারো হয়েছে। চাঁদ চলে এসেছে হাতের মুঠোয়। কে আর
পায় কাজের হদিস। অতি সহজেই এবার ভাগবাটোয়ারা করে হজম করা যাবে প্রকল্পের
সোয়া ৬ কোটি টাকা!

এমন তুঘলকি কাণ্ড ঘটেছে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে শেরখাই ও নরখাই নদীর খনন কাজ
প্রকল্পে। জাইকার অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে স্থানীয়
সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গ্রহণ
করা এ প্রকল্পটির কাজ করছেন স্থানীয় যুবলীগ নেতা। 'প্রকল্প বাস্তবায়ন
কমিটির' মাধ্যমে তিনি এ কাজটি করছেন।

এদিকে বিদেশি সাহায্যের টাকার এমন লুটপাটে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় বাসিন্দা জালাল উদ্দিন বলেন, মূলত নদী দু'টি যদি কমপক্ষে ১০-১৫
হাত গভীর করে খনন করা হতো তাহলে এলাকাবাসীর উপকার হতো। যে পরিমাণ খনন করা
হচ্ছে, এটা এক মৌসুমেই ভরাট হয়ে যাবে। তাই কোনো কাজে লাগবে না এ খাল খনন
কর্মসূচি।

স্থানীয় মুরুব্বি মাওলানা আব্দুর রহিম বলেন, সরকারি প্রজেক্টের খাল খনন
করা হচ্ছে। এ খালের খনন করা মাটি পাশে রাখার কথা হলেও সেই মাটি অন্যত্র
বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। ২-৩ ফুট গভীর করে কী লাভ। এক বছরেই সব ভরাট হয়ে
যাবে। এটা নদী খনন না উঠান প্রলেপ বোঝা যাচ্ছে না। নদী বলেন, আর খাল
বলেন, এ প্রজেক্টে পুকুর চুরি হচ্ছে।

ছাদিক মিয়া নামে একজন বলেন, জাইকা প্রকল্পের জন্য যে সমিতি গঠন করা হয়েছে
তা সম্পূর্ণ সাজানো। লোক দেখানো প্রলেপ দিয়েই নদী খনন দেখানো হচ্ছে। ২-৩
ফুট নদী খনন করে সরকারের কোটি কোটি টাকা নয় ছয় করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও
আবার খননই করা হয়নি। আর নবীগঞ্জ প্রকৌশলী অফিস কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে
প্রজেক্টের কাজে নয় ছয় করছে। শষ্যের মধ্যে ভূত থাকলে তাড়াবে কে? এ নিয়ে
অভিযোগ দিয়ে, মানববন্ধন করেও কোনো লাভ হয়নি।

তিনি বলেন, অফিসের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ না করেতো আর ঠিকাদার লুটপাটের
প্রক্রিয়া সাজায়নি। উভয়পক্ষ মিলেমিশেই লুটপাটের এ প্রক্রিয়া সাজিয়েছে।
তিনি এ বিষয়টি সম্পর্কে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নজর দেওয়ার দাবি জানান।

শেরখাই ও নরখাই নদীর খনন প্রকল্পের সভাপতি খালেদ হাসান দোলন কিছু অসংলগ্ন
উত্তর দেন। তিনি কখনও বলেন, আমরা কাজ করছি না। আবার কখনও বলেন, এ কাজ
আমরা টেন্ডারের মাধ্যমে করছি। কোনো অনিয়ম হলে সেটা উপজেলা প্রকৌশলী অফিস
দেখবে।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি সভাপতি হলেও কাজ করে ঠিকাদার ও
প্রকৌশলী অফিস। তারা আমাদের সমিতিকে একটি লাভ্যাংশ দেবেন। অনিয়ম হলে তারা
জবাব দেবেন। মাটি বিক্রি করা হয়েছে কি না আমি জানি না। তবে এলাকার কিছু
মানুষ নিজের প্রয়োজনে মাটি নিয়ে গেছেন আমাদের অনুমতি নিয়ে।

নবীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী অফিসের প্রজেক্টের দায়িত্বরত সহকারী প্রকৌশলী
সিরাজ মোল্লা বলেন, আমি সবকিছু জানি না। আমাদের দেখাশোনার দায়িত্ব, তাই
দেখছি।

উপজেলা প্রকৌশলী সাব্বীর আহমেদ বলেন, নদীটির মোট ৩৮০০ মিটার খনন করার কাজ
এটি। আমার জানামতে ৫০০-৬০০ মিটার এখনও বাকি রয়েছে।

কাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা হলে তিনি বলেন, এটি বর্ষার পানি না। বৃষ্টির
পানি। এ পানি নেমে যাবে। সামনে চৈত্র মাস। তখন পানি কমলে বাকি পানি
অপসারণ করে তারা কাজটি করে নেবে। কাজ না করলে তারা বিলও পাবে না।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, নবীগঞ্জ উপজেলার দীঘলবাক ইউনিয়নের কামারগাঁও
এলাকায় শেরখাই ও নরখাই নদীটি দীর্ঘদিন ধরে ভরে উঠেছিল। এ অবস্থায় নদীগুলো
শুকিয়ে কাঠ হয়ে পড়ে। ফলে ওই এলাকায় কৃষি জমিতে মারাত্মক সেচ সংকট দেখা
দেয়। এমন পরিস্থিতিতে জাইকা প্রকল্পের অর্থায়নে নদীটি খননের উদ্যোগ নেয়
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বরাদ্দ দেওয়া হয় ৬ কোটি ১২
লাখ টাকা। প্রকল্প কমিটি করে কাজটি কমিটিকে দেওয়া হয়। কমিটির সভাপতি করা
হয় ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ হাসান দোলনকে। তিনি নিজস্ব লোক
দিয়ে একটি সাজানো কমিটি গঠন করেন। কৌশলে কমিটিতে আওয়ামী লীগ সরকার
পরিবর্তনের পর এলাকার কিছু বিএনপি ও এনসিপি নেতা কর্মীদের সংযুক্ত করেন।
কিন্তু যুবলীগ নেতা খালেদ হাসান দোলনের সাজানো কমিটি দিয়েই চলছে লুটপাট।

নদী দু'টির মধ্যে ২-৩ ফুট খনন করে প্রকল্পের মাটি অন্যত্র বিক্রি করে
দেওয়া হচ্ছে। অথচ কাজের শর্ত অনুযায়ী ১০ ফুট খনন, নদীর তীরে বাঁধ
নির্মাণ, শতাধিক শ্রমিক নিয়োগ করার কথা থাকলেও এর কিছুই মানা হচ্ছে না।
স্থান ভেদে কোথাও ২ ফুট, কোথাও বাঁধের মাটি সমান করা, কোথাও কোনো কাজ না
করেই বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন প্রকল্প কমিটির সভাপতিসহ সদস্যরা।
যেন বৃষ্টি এলে নদী পানিতে ডুবে যায়। বলা যাবে কাজ হয়েছে।

বর্তমানে সব পানিতে তলিয়ে গেছে। তাদের সেই আশা পূর্ণও হয়েছে। দুই দিনের
বৃষ্টিতেই নদীতে পানি এসেছে। কোথায় কী কাজ হয়েছে তা এখন আর দেখা যায় না।
দৃশ্যমান শুধু নদীগুলোর তীরে মাটি সমান করা। এটিতেই তারা বুঝাতে চেয়েছেন
কাজ পূর্ণ হয়েছে।

এখন স্থানীয়দের দাবি, যেন সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কমিটি করে এমন ভয়াবহ
লুটপাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অন্যথায় সরকারের কোটি কোটি টাকা
অপচয় হবে। কিন্তু মানুষের কোনো উপকার হবে না। খাল কাটা কর্মসূচিও ভেস্তে
যাবে। সফলতার মুখ দেখতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে
বলেও তারা দাবি জানান।

এফএ/জেআইএম
আরও পরুন
https://www.jagonews24.com/country/news/1104116